November 6, 2026

আসামের উচ্ছেদ নীতি ও বাঙালি মুসলিমদের সংকট: প্রাসঙ্গিক প্রেক্ষাপট

0
আসামে ব্যাপক উচ্ছেদ অভিযান: বনভূমি দখলমুক্তের পাশাপাশি মসজিদ ভাঙার অভিযোগ, বাস্তুচ্যুত সহস্রাধিক পরিবার

বিশেষ সংবাদদাতা | আসাম

ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় আসাম রাজ্যে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) দলীয় মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মার সরকারের নেতৃত্বে ব্যাপক উচ্ছেদ অভিযান পরিচালিত হয়েছে। নগাঁও, হোজাই ও গোলাঘাট—এই তিনটি জেলায় এক সপ্তাহের বিশেষ অভিযানে প্রায় ৬৩৮ হেক্টরেরও বেশি সরকারি বনাঞ্চল দখলমুক্ত করেছে রাজ্য প্রশাসন। তবে এ অভিযানে সহস্রাধিক পরিবার গৃহহীন হয়ে পড়েছে, যাদের সিংহভাগই বাঙালি মুসলিম। পাশাপাশি অভিযানে একাধিক মসজিদ ভেঙে ফেলার গুরুতর অভিযোগ তুলেছে স্থানীয় সংখ্যালঘু সংগঠনগুলো।

অভিযানের সার্বিক চিত্র

রাজ্য বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, গত শনি ও রোববার নগাঁও, হোজাই এবং গোলাঘাট জেলায় উচ্ছেদ অভিযানের মূল জোর দেওয়া হয়। এর মধ্যে রোববার নগাঁও জেলার লুতুমাই সংরক্ষিত বনাঞ্চলে ইতিহাসের অন্যতম বড় অভিযান চালানো হয়। সেখানে মাত্র এক দিনেই প্রায় ৩১৪ হেক্টর জমি দখলমুক্ত করে প্রশাসন।

সরকারি হিসাব অনুযায়ী, লুতুমাই বনাঞ্চল এলাকাতেই প্রায় ৫৫০টি পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে তিনটি জেলা মিলিয়ে উচ্ছেদ হওয়া মোট পরিবারের সংখ্যা প্রায় এক হাজারের কাছাকাছি পৌঁছাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

প্রশাসনের বক্তব্য ও মুখ্যমন্ত্রীর দাবি

উচ্ছেদ অভিযান প্রসঙ্গে আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা দাবি করেন, প্রশাসন রাজ্যের উন্নয়নের ‘রুদ্র রূপ’ প্রদর্শন করেছে। রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সুরক্ষিত বনাঞ্চল রক্ষা করা এবং অবৈধভাবে গড়ে ওঠা নানা স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়া ছিল এই অভিযানের মূল উদ্দেশ্য।

বন কর্মকর্তাদের দাবি, সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটি আদালত ও আইনের নির্দেশনা মেনেই সম্পন্ন করা হয়েছে। গত আগস্ট মাসেই পুরো এলাকায় মাইকিং করে বাসিন্দাদের নিজ দায়িত্বে এলাকা ছেড়ে যাওয়ার অনুরোধ করা হয়েছিল। ফলে মূল অভিযান শুরু হওয়ার আগেই প্রায় ৯০ শতাংশ বাসিন্দা স্বতঃস্ফূর্তভাবে জায়গা খালি করে চলে যান।

বৈষম্য ও উপাসনালয় ভাঙার অভিযোগ

অন্যদিকে সরকারের এই উচ্ছেদ অভিযানকে ‘পক্ষপাতদুষ্ট ও বৈষম্যমূলক’ আখ্যা দিয়েছে বিভিন্ন স্থানীয় ও ছাত্রসংগঠন। অল আসাম মাইনরিটিজ স্টুডেন্টস ইউনিয়ন (AAMSU)-এর পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, আদালতের নির্দেশের দোহাই দিয়ে প্রকৃতপক্ষে নির্দিষ্ট একটি সম্প্রদায়কে (বাঙালি মুসলিম) নিশানা করা হচ্ছে।

সংগঠনটির সভাপতি অভিযোগ করেন, গত রোববারের অভিযানে সহস্রাধিক ঘরবাড়ি গুঁড়িয়ে দেওয়ার পাশাপাশি একাধিক মসজিদও ভেঙে ফেলা হয়েছে। তিনি আরও জানান, লুতুমাই বনাঞ্চল থেকে যাঁদের উচ্ছেদ করা হয়েছে, তাঁদের একটি বড় অংশকে ১৯৭৩ সালে তৎকালীন সরকারই সাময়িকভাবে পুনর্বাসিত করেছিল। এখন তাঁদের বিকল্প আশ্রয়ের ব্যবস্থা না করেই জোরপূর্বক তাড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। অথচ একই এলাকায় থাকা অন্য ধর্মাবলম্বী বাসিন্দাদের ক্ষেত্রে এখনও কোনো উচ্ছেদ নোটিশও দেওয়া হয়নি।

সামাজিক ও মানবাধিকার সংকট

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং মানবাধিকার কর্মীদের একাংশের দাবি, অভিযানে ১,১০০-এরও বেশি পরিবারকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত করা হয়েছে। হুট করে ভিটেমাটি হারিয়ে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে খোলা আকাশের নিচে দিন কাটাচ্ছেন হাজার হাজার মানুষ, যার মধ্যে বিপুলসংখ্যক নারী ও শিশু রয়েছেন।

বনভূমি উদ্ধার বনাম গৃহহীনদের পুনর্বাসনের এই দ্বন্দ্বে আসামের সীমান্ত জেলাগুলোতে এখন এক চরম স্পর্শকাতর ও থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *